ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় বাংলাদেশের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। তবে ইতিহাসের এই সুদীর্ঘ পথচলায় ছাত্ররাজনীতির যে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় আমরা দেখি, তার সমান্তরালে অনেক রক্তক্ষয়ী ও কলঙ্কিত ঘটনাও মিশে আছে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার দাপট এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি করেছিল। যে ঘটনাগুলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের এক একটি ক্ষতচিহ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার হলেও, আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত এখানে ছাত্ররাজনীতির এক বীভৎস রূপ পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং অন্য সংগঠনের সাথে তাদের সশস্ত্র সংঘাত ক্যাম্পাসকে বারবার অস্থিতিশীল ও রক্তাক্ত করেছে। কয়েকটিতে আলোকপাত করি চলুন
আশির দশকের শেষদিকে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা চরমে পৌঁছায়। ১৯৮৭ সালের ৯ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। তৎকালীন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক বাবলু এবং তার দুই সহযোগী মাঈনুদ্দিন ও নূর মোহাম্মদ সেখানে বোমা তৈরি করতে গিয়ে নিজেরাই প্রাণ হারান। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে ছাত্ররাজনীতির নামে কীভাবে হলের কক্ষগুলোকে অস্ত্র ও বিস্ফোরকের গুদামে পরিণত করা হয়েছিল। একই বছরে জাসদ ছাত্রলীগের সাথে সংঘর্ষে মুন্না নামে এক ছাত্রের পাশাপাশি আব্দুর রহিম নামের এক রিকশাচালক এবং কামরুল হাসান নামের এক পথচারী নিহত হন—যা সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাহীনতাকে ফুটিয়ে তোলে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতেও ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল থামেনি। ১৯৮৮ সালে বজলুর রশীদ এবং ১৯৮৯ সালে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কফিল উদ্দিন কনক নিহত হন। তবে ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ তারিখটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কালো দিন হয়ে আছে। সেদিন ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের ভয়াবহ গোলাগুলির প্রতিবাদে মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে নিহত হন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও মেধাবী ছাত্র মঈন হোসেন রাজু। সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের সেই শহীদ রাজুর স্মৃতিতেই আজ টিএসসিতে ‘সন্ত্রাস বিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য’ দাঁড়িয়ে আছে, যা তৎকালীন ছাত্রদলের সশস্ত্র রাজনীতির এক নীরব সাক্ষী।
ছাত্রদলের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিপক্ষের চেয়ে তারা নিজেদের মধ্যে সংঘাতেই বেশি লিপ্ত ছিল। ১৯৯২ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ইলিয়াস গ্রুপ এবং রতন গ্রুপের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান। ১৯৯৩ সালে কেন্দ্রীয় নাট্য সম্পাদক জিন্নাহকে হত্যার পেছনে মূল কারণ ছিল চাঁদা আদায়ের ভাগ-বাটোয়ারা। ক্ষমতার ভাগাভাগি ও হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে ১৯৯৪ সালে সরোয়ার খান মিঠু এবং ১৯৯৭ সালে আরিফ হোসেন তাজকে প্রাণ দিতে হয়। ১৯৯৮ সালে মধুর ক্যান্টিনের মতো জায়গায় ছাত্রলীগ নেতা পার্থ প্রতিম আচার্যকে গুলি করে হত্যা করাও ছিল সেই চরম অসহিষ্ণু রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।
২০০২ সালের ২৩ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অন্যতম একটি ন্যাক্কারজনক দিন। তৎকালীন বিএনপি সরকারের মদদে পুলিশ বাহিনী ও ছাত্রদলের ক্যাডাররা গভীর রাতে শামসুন্নাহার হলে ঢুকে সাধারণ ছাত্রীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। ছাত্রীদের ওপর এই পাশবিক নির্যাতন এবং লাঞ্ছনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ওপর চরম আঘাত ছিল, যা আজও মানুষকে শিউরে ওঠে।
এই দীর্ঘ তালিকাটি কেবল কিছু ব্যক্তির মৃত্যুর খবর নয়, বরং এটি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংসের দলিল। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ এবং পেশিশক্তির চর্চা কীভাবে মেধাবী ছাত্রদের বিপথে নিয়ে যায় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে, ছাত্রদলের এই কর্মকাণ্ডগুলো তারই প্রমাণ। যারা আজ এই ইতিহাসগুলোকে অস্বীকার করতে চান বা জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন, তারা মূলত সত্যকে আড়াল করতেই অভ্যস্ত। ইতিহাস তার আপন গতিতে চলে এবং এই প্রতিটি রক্তের ফোঁটা ও অন্যায়ের বিচার ইতিহাসের পাতায় চিরকাল সংরক্ষিত থাকবে।
©২০২৬ . [ঢাকা ফ্লাক্স] কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত