শিক্ষার্থী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ভারতবর্ষের মুসলিমরা একসময় লড়তে জানতেন। একইসাথে আজকের দিনের মতো বিশ্বাসঘাতক এর বসতি তখনো সরব ছিলো। সে ইতিহাসই আজ লিখতে বসেছি।
১৮৩১ সালের ৬ই মে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মানসেহরা জেলার এক নিভৃত পাহাড়ি জনপদ ‘বালাকোট’। কুনহার নদীর তীরের সেই ছোট্ট উপত্যকাটি সেদিন কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল ভারতবর্ষের মুসলিম ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডির রঙ্গমঞ্চ। বালাকোটের যুদ্ধ কোনো সাধারণ ক্ষমতাবদলের লড়াই ছিল না; এটি ছিল পরাধীনতার শেকল ভাঙার এক মরিয়া চেষ্টা, হৃদয়ের হাহাকারের বহিঃপ্রকাশ।
বালাকোটের ঘটনার প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আরও অন্তত এক দশক পেছনে। তৎকালীন ভারতের পাঞ্জাব এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের শিখ শাসন তখন তুঙ্গে। শিখ সাম্রাজ্যের সেই দিনগুলোতে মুসলিমদের জীবন ছিল ওষ্ঠাগত। ধর্মীয় স্বাধীনতা বলতে কিছুই ছিল না। অনেক এলাকায় প্রকাশ্যে আজান দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, এমনকি মসজিদের পবিত্র প্রাঙ্গণকে ঘোড়ার আস্তাবল হিসেবে ব্যবহার করার মতো ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এই চরম অবমাননা আর ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার সাধারণ মুসলিমদের হৃদয়ে তখন মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সেই ক্রান্তিলগ্নে আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হন সৈয়দ আহমদ বেরলভী (র.)। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল দোয়া বা তসবিহ পাঠ করে এই পরাধীনতা থেকে মুক্তি মিলবে না; প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত আন্দোলন।
তিনি রায়বেরেলি থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষকে জাগ্রত করলেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি, জমিজমা এবং পরিবার ছেড়ে এক অজানা গন্তব্যের দিকে পা বাড়ালেন। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—একটি স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানুষ সম্মানের সাথে নিজ ধর্ম পালন করতে পারবে।
সৈয়দ আহমদ বেরলভীর এই কাফেলায় যারা শামিল হয়েছিলেন, তাদের বলা হতো ‘মুজাহিদ’। এই মুজাহিদদের হিজরত ছিল ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ। তারা ব্রিটিশ শাসিত এলাকা দিয়ে না গিয়ে সুদূর রাজস্থান ও সিন্ধু হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্তে পৌঁছান। পথে কত রাত তারা অনাহারে কাটিয়েছেন, কত ঝরনা আর রুক্ষ পাহাড় অতিক্রম করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। তাদের চোখে ছিল মদিনার সেই সোনালী যুগের স্বপ্ন।
১৮২৬ সালে তারা সীমান্তে পৌঁছানোর পর শিখ বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু খণ্ডযুদ্ধে জয়লাভ করেন। ১৮৩০ সালে তারা সাময়িকভাবে পেশোয়ার দখল করতে সক্ষম হন এবং সেখানে একটি ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন। কিন্তু এই সফলতার মাঝেই লুকিয়ে ছিল ট্র্যাজেডির বীজ।
বিশ্বাসঘাতকতা: ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়
বালাকোটের যুদ্ধের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশটি কেবল শিখদের সাথে লড়াই নয়, বরং ঘরের শত্রুদের বিশ্বাসঘাতকতা। মুজাহিদরা যখন একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়তে চাইলেন, তখন স্থানীয় কিছু গোত্রীয় সর্দার ও প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের নিজেদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত হানার ভয়ে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। সৈয়দ আহমদ বেরলভী যে ইসলামের সাম্য ও ন্যায়ের বাণী নিয়ে এসেছিলেন, তা অনেকের কাছেই ছিল অসহ্য। ফলে তারা গোপনে শিখ বাহিনীর সাথে আঁতাত করতে শুরু করে।
এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিশ্বাসঘাতকতার মুখে মুজাহিদরা কৌশলগত কারণে পেশোয়ার ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বালাকোটের পাহাড়ি উপত্যকায় অবস্থান নেন। তারা ভেবেছিলেন কুনহার নদী এবং চারপাশের সুউচ্চ পাহাড় তাদের প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেবে। কিন্তু তারা জানতেন না, বিশ্বাসঘাতকরা শিখ বাহিনীকে গোপন পাহাড়ি পথ দেখিয়ে দিয়ে তাদের একেবারে দরজায় নিয়ে আসবে।
১৮৩১ সালের ৬ই মে’র সকালটি যখন উদিত হয়েছিল, তখন বালাকোটের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। শিখ জেনারেল শের সিংয়ের নেতৃত্বে এক বিশাল এবং আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী পাহাড়ের ওপর থেকে মুজাহিদদের ঘিরে ফেলে। মুজাহিদদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার, যাদের কাছে না ছিল পর্যাপ্ত গোলাবারুদ, না ছিল কামানের গোলা। তাদের একমাত্র অস্ত্র ছিল তলোয়ার আর বুকভরা সাহস।
যুদ্ধ শুরু হতেই মেঠো মাঠ রক্তে রঞ্জিত হতে শুরু করে। প্রতিটি ইঞ্চি মাটির জন্য লড়াই হয়েছিল। মুজাহিদরা জানতেন তাদের ফেরার পথ বন্ধ, তাই তারা একেকজন সিংহের মতো লড়ে যাচ্ছিলেন। সৈয়দ আহমদ বেরলভী নিজে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি যখন কুনহার নদীর তীরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন চতুর্দিক থেকে শিখ বাহিনীর গুলিবর্ষণ শুরু হয়। হঠাৎ একটি গুলি তার কপালে বিদ্ধ হয় এবং তিনি শাহাদাতের সুধা পান করেন।
একইভাবে তাঁর প্রধান সেনাপতি এবং সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত শাহ ইসমাইল শহীদ (র.) বীরত্বের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হন। নেতৃত্বের পতনের পর মুজাহিদদের মধ্যে এক ধরণের হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে। শিখ বাহিনী তখন উপত্যকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বালাকোটের সবুজ ঘাস মুসলিমদের পবিত্র রক্তে লাল হয়ে যায়।
বালাকোটের এই পরাজয় কেবল একটি সামরিক পরাজয় ছিল না; এটি ছিল গোটা উপমহাদেশের মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশাল আধ্যাত্মিক শোক। যে মানুষগুলো ঘর ছেড়েছিলেন পরকালের আশায় এবং একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্নে, তাদের স্বপ্নগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল বালাকোটের ধূলিকণায়। শাহাদাতের খবর যখন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছাল, তখন ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গিয়েছিল। মুজাহিদদের সেই শাহাদাত বরণের কাহিনী আজও এ অঞ্চলের মুসলিমদের উজ্জীবিত করে।
©২০২৬ . [ঢাকা ফ্লাক্স] কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত